আধুনিক স্মার্টফোনে পানি প্রতিরোধের জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তি, আইপি রেটিং এবং সীমাবদ্ধতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ

আপনার স্মার্টফোনটি হঠাৎ পানিতে পড়ে গেলে কী হবে? সুইমিং পুলে, রান্নাঘরের সিংকে, কিংবা ভাবতেও কষ্ট লাগে টয়লেটে? কয়েক বছর আগেও এর মানে ছিল নিশ্চিত মোবাইল নষ্ট হয়ে যাওয়া। কিন্তু এখন আইফোন, স্যামসাং গ্যালাক্সি এস এর মতো আধুনিক ফোনগুলো পানির সংস্পর্শে টিকে যেতে পারে। প্রশ্ন হলো—এই ‘জাদু’ কীভাবে কাজ করে?
পানিরোধী নাকি পানি-প্রতিরোধী? পার্থক্য বুঝুন
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার: প্রকৃতপক্ষে খুব কম ফোনই শতভাগ ‘ওয়াটারপ্রুফ’ বা পানিরোধী। বেশিরভাগই আসলে ‘ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্ট’ বা পানি-প্রতিরোধী। পানিরোধী মানে পানি থেকে সম্পূর্ণভাবে রক্ষিত, যেখানে পানি-প্রতিরোধী মানে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত পানির প্রবেশ ঠেকাতে সক্ষম।
অনেক কোম্পানি তাদের ডিভাইসকে ‘ওয়াটারপ্রুফ’ বলে বিজ্ঞাপন দেয়, কিন্তু বাস্তবে এমন কোনো ফোন নেই যা সম্পূর্ণ পানিরোধী। কারণ যথেষ্ট চাপ এবং সময় দিলে পানি যেকোনো বাধা ভেদ করতে পারে, এটা শুধু সময়ের ব্যাপার।
আইপি রেটিং বোঝা জরুরি
আপনি হয়তো ফোনের স্পেসিফিকেশনে ‘আইপি৬৮’ (IP68) বা ‘আইপি৬৭’ লেখা দেখেছেন। এটি কী?
আইপি রেটিং হলো একটি আন্তর্জাতিক মান যা ডিভাইসকে কঠিন পদার্থ (যেমন ধুলো) এবং তরল (মূলত পানি) থেকে কতটা সুরক্ষিত তা পরিমাপ করে। ‘আইপি’ (Ingress Protection) অক্ষরের পর দুটি সংখ্যা থাকে, যেমন আইপি৬৮।
প্রথম সংখ্যা (৬) নির্দেশ করে ধুলো এবং কঠিন পদার্থ প্রতিরোধ ক্ষমতা, যার স্কেল ০ (কোনো সুরক্ষা নেই) থেকে ৬ (সর্বোচ্চ সুরক্ষা)। দ্বিতীয় সংখ্যা (৮) নির্দেশ করে পানি প্রতিরোধ ক্ষমতা, যার স্কেল ০ থেকে ৯ পর্যন্ত।
আইপি৬৮ রেটিং মানে ফোনটি সম্পূর্ণ ধুলো-প্রতিরোধী এবং ১.৫ মিটার গভীর পানিতে ৩০ মিনিট পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। তবে এটি শুধু ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফল। বাস্তব পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে।
স্মার্টফোন পানি-প্রতিরোধী করার কৌশল
একটি স্মার্টফোনকে পানি-প্রতিরোধী করা মোটেও সহজ কাজ নয়। কল্পনা করুন একটি ডিমের কথা। একটি নিরবচ্ছিন্ন খোসা, যেখানে পানি ঢোকার কোনো পথ নেই। কিন্তু এবার ভাবুন একটি প্লাস্টিকের ইস্টার ডিমের কথা, যেটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। হঠাৎ করেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
আপনার ফোনে শুধু একটি বা দুটি ফাঁক নেই, অসংখ্য ফাঁক রয়েছে। প্রতিটি পোর্ট, বাটন, সুইচ, ক্যামেরা, ফ্ল্যাশ, ইউএসবি পোর্ট, সিম কার্ড ট্রে, স্পিকার এবং মাইক্রোফোনের ছিদ্র, সবগুলোই সম্ভাব্য দুর্বল বিন্দু যেখান দিয়ে পানি ঢুকতে পারে।
আঠা, টেপ এবং অ্যাডহেসিভ স্ট্রিপ
উৎপাদকরা একটি আশ্চর্যজনক সহজ কিন্তু কার্যকর কৌশল ব্যবহার করেন: আঠা। প্রচুর পরিমাণ আঠা। এগুলোকে গ্যাসকেট, সিল, টেপ বা অ্যাডহেসিভ বলা হয়। কিন্তু সবগুলোর অর্থ একই: আঠালো, রাবারের মতো পদার্থ যা বায়ুরোধী সিল তৈরি করে। আপনার ফোনের স্ক্রিন এবং ফ্রেমের মধ্যে একটি শক্তিশালী আঠালো স্ট্রিপ থাকে যা পানি ঢোকা থেকে রক্ষা করে। একইভাবে, ফোনের পিছনের কভার শক্তিশালী আঠালো দিয়ে আটকানো থাকে।

পোর্টগুলোর পেছনে (যেমন ইউএসবি, লাইটনিং বা হেডফোন জ্যাক) এবং ফ্রেমের প্রান্তের কাছে উন্মুক্ত সার্কিটগুলোতেও আঠা লাগানো হয়।
রাবার গ্যাসকেট এবং ও-রিং
তবে সব জায়গায় আঠা কাজ করে না। বোতাম, পোর্ট এবং অপসারণযোগ্য অংশগুলোতে দৃশ্যমান আঠা থাকতে পারে না। এখানে ব্যবহার করা হয় রাবার গ্যাসকেট বা ও-রিং।
এগুলো ছোট রাবারের বলয় যা ফোনের ভেতরের পৃষ্ঠের সাথে চাপ দিয়ে লাগানো থাকে এবং শক্তভাবে আটকানোর সময় প্রসারিত হয়ে ফাঁক বন্ধ করে দেয়। হেডফোন জ্যাক, চার্জিং পোর্ট এবং সিম কার্ড ট্রের চারপাশে এই রাবার গ্যাসকেট খুঁজে পাওয়া যায়।
বাটনগুলোর জন্য ভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়: একটি সিলিকন রাবারের ‘বুট’ যা আপনার চাপা বাহ্যিক অংশকে ভেতরের ইলেকট্রিক্যাল কন্টাক্ট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখে। এটি অনেকটা ভেজা রাস্তায় বের হওয়ার আগে জুতার ওপর প্লাস্টিকের ব্যাগ পরার মতো।
ন্যানোকোটিং প্রযুক্তি
এসবের পরেও একটি অতিরিক্ত সুরক্ষা স্তর যুক্ত করা হয়: সার্কিট বোর্ডে অতি-পাতলা পলিমার ন্যানোকোটিং। এই আবরণ পানি বিতাড়নে সাহায্য করে এবং সার্কিটকে রক্ষা করে।
স্পিকার এবং মাইক্রোফোনের জন্য বিশেষ ম্যাশ
স্পিকার এবং মাইক্রোফোন একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কারণ এগুলো শব্দ তৈরি করতে বাতাসের প্রয়োজন। বাতাসে কম্পন সৃষ্টি করেই এরা শব্দ উৎপাদন করে। তাই এগুলো সম্পূর্ণ সিল করা সম্ভব নয়।

সমাধান? অত্যন্ত সূক্ষ্ম জালের ব্যবহার। এই জাল বাতাস চলাচলের অনুমতি দেয়, কিন্তু পানির জন্য বাধা তৈরি করে। পানির অণুর কোহেশন (একে অপরকে আকর্ষণ) এবং সারফেস টেনশনের কারণে পানি নিজের সাথে লেগে থাকতে চায়, সূক্ষ্ম জাল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করতে চায় না।
কিছু ক্ষেত্রে, যেমন আইফোন বা গ্যালাক্সি এস-এর মাইক্রোফোনে, আরও উন্নত প্রেশার ভেন্ট ব্যবহার করা হয়। এখানে জালের সাথে একটি পানি-প্রতিরোধী, শ্বাসপ্রশ্বাসযোগ্য ফ্যাব্রিক মেমব্রেন (ePTFE—যেমন গোর-টেক্স) যুক্ত করা হয় যা বাতাস চলাচল করতে এবং চাপ সমান করতে সাহায্য করে।
বাস্তব ব্যবহারে কতটা নিরাপদ?
তত্ত্বের চেয়ে বাস্তবতা অনেক জটিল। আইপি রেটিং শুধু নির্দিষ্ট ল্যাব পরিস্থিতিতে পরীক্ষার ফলাফল। এগুলো নিশ্চিত করে যে ফোনটি:
– স্বাদু পানির ফোঁটা সহ্য করতে পারে
– স্বাদু পানির জেট সহ্য করতে পারে
– কয়েক ফুট স্বাদু পানিতে ধীরে ধীরে ডুবিয়ে ৩০ মিনিট টিকে থাকতে পারে
কিন্তু আইপি রেটিং কিছু বিষয়ে নিশ্চয়তা দেয় না:
– পানির নিচে ফোন ব্যবহার করা যাবে কিনা
– হঠাৎ পানিতে ফেলে দিলে কী হবে (আস্তে আস্তে ডোবানো নয়)
– অন্যান্য তরল (যেমন সমুদ্রের লবণ পানি, ক্লোরিনযুক্ত পুলের পানি, পানীয়) থেকে রক্ষা পাবে কিনা
সনির তিক্ত অভিজ্ঞতা
সনি একসময় গর্বের সাথে বিজ্ঞাপন দিত যে তাদের এক্সপেরিয়া ফোনে পানির নিচে ছবি তোলা যায়। কিন্তু ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় সনি সমস্যায় পড়ে যখন গ্রাহকরা দাবি করেন যে সুইমিং পুলে সাঁতার কাটার পর তাদের ফোন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে এবং মরিচা ধরেছে।
সমস্যা ছিল: অস্ট্রেলিয়ার বাড়ির সুইমিং পুলে সাধারণত লবণ পানি ব্যবহার করা হয়, যা সিলগুলোকে ক্ষয় করতে পারে। রাতারাতি সনি তাদের অবস্থান বদলে ফেলে এবং স্পষ্টভাবে জানায় যে ফোনগুলো পানির নিচে ব্যবহার করা উচিত নয় এবং লবণ থেকে দূরে রাখতে হবে।
অ্যাপল এবং স্যামসাং-এর সতর্কতা
অ্যাপল স্পষ্ট করে বলে যে আপনার আইফোনকে কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে পানিতে ডোবানো উচিত নয়। কোম্পানিটির দীর্ঘ তালিকা রয়েছে যেসব কাজ পানি-প্রতিরোধী ফোনেও করা উচিত নয়। এমনকি পানিতে ভিজে গেলে অ্যাপল সুপারিশ করে কমপক্ষে পাঁচ ঘণ্টা শুকিয়ে নেওয়ার পরেই চার্জ করতে। স্যামসাংও অনুরূপ সতর্কতা দেয়, যদিও তারা পানি-প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে কিছুটা বেশি আত্মবিশ্বাসী।
ওয়ারেন্টি কভার করে না!
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: এই কোম্পানিগুলো তাদের ফোন পানি-প্রতিরোধী দাবি করলেও, কোনো কোম্পানির ওয়ারেন্টি পানির ক্ষতি কভার করে না। অ্যাপল এবং স্যামসাং, সবাই স্পষ্টভাবে বলে যে পানির ক্ষতি ওয়ারেন্টির অন্তর্ভুক্ত নয়।
তদুপরি, প্রতিটি কোম্পানি তাদের ফোনের ভেতরে ছোট স্টিকার রাখে যা পানির সংস্পর্শে এলে রঙ পরিবর্তন করে। এভাবে তারা বুঝতে পারে ক্ষতি কীভাবে হয়েছে।
আপনি কি যুক্তি দিতে পারবেন যে ত্রুটিপূর্ণ পানি-প্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণে সার্কিট ভিজে গেছে? সম্ভবত। কিন্তু আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে যে কোম্পানিগুলো এই অলিখিত প্রতিশ্রুতি মানবে, যখন তারা সহজেই পানির ক্ষতিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে যে আপনি নিজেই আপনার ফোন নষ্ট করেছেন।
দীর্ঘমেয়াদে পানি-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: সময়ের সাথে সাথে পানি-প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। আঠালো পদার্থ শুকিয়ে যায়, রাবার গ্যাসকেট ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, এবং সাধারণ ব্যবহারের ফলে ছোট ছোট ক্ষতি হতে পারে। ফোনটি যদি কখনো পড়ে যায় বা চাপ পায়, তাহলে সিলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং পানি-প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাতে পারে। তাই নতুন ফোনে যে সুরক্ষা ছিল, এক-দুই বছর পরে সেটা নাও থাকতে পারে।
কি শিখলাম?
স্মার্টফোনের পানি-প্রতিরোধ প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার অগ্রগতি। বৃষ্টিতে ইমেইল শেষ করা, রান্নাঘরে ফোন রাখা বা এমনকি গোসলের সময় দরকারি নোট নেওয়া, এসব এখন সম্ভব। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আপনি ফোনটিকে সুইমিং পুলে নিয়ে যাবেন বা সমুদ্রে ডুব দেবেন। প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আঠা, রাবার গ্যাসকেট, ন্যানোকোটিং এবং বিশেষ ম্যাশ এই সবকিছু মিলে একটি কার্যকর কিন্তু অপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে। মনে রাখবেন: পানি-প্রতিরোধী মানে পানিরোধী নয়, এবং সাবধানতাই হলো সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা।
সূত্র: প্রসটেক, সিনেট