রেডিও তরঙ্গ থেকে স্মার্টফোন: মোবাইল ফোনের প্রযুক্তিগত যাত্রা এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব

হাঁটতে হাঁটতে ফোনে কথা বলা, ট্রেনে বসে অফিসের কাজ সারা, সবসময় যোগাযোগে থাকা – মোবাইল ফোন আমাদের জীবনযাত্রা এবং কাজের ধরন সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে ১০ বছরের বেশি বয়সী ৮০ শতাংশ মানুষের কাছে মোবাইল ফোন আছে এবং মোবাইল সাবস্ক্রিপশনের সংখ্যা ৯.১ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে – যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি! উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে ল্যান্ডলাইন টেলিফোন নেটওয়ার্ক সীমিত, সেখানে ৯৩ শতাংশের বেশি ফোনই মোবাইল ফোন।
কিন্তু এই ছোট্ট যন্ত্রটি আসলে কীভাবে কাজ করে? কীভাবে তার ছাড়াই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আমাদের কণ্ঠস্বর পৌঁছে যায়? চলুন জেনে নেওয়া যাক মোবাইল ফোনের রহস্যময় জগত।
ল্যান্ডলাইন আর মোবাইল: পার্থক্য কোথায়?
ল্যান্ডলাইন এবং মোবাইল ফোন উভয়ই একই কাজ করে – মানুষের মধ্যে কথোপকথন সম্ভব করে। কিন্তু তাদের কাজের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা।
ল্যান্ডলাইন টেলিফোন তারের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠায়। আপনি যখন ল্যান্ডলাইনে কথা বলেন, আপনার কণ্ঠস্বর বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত হয়ে সরাসরি তারের মধ্য দিয়ে অপর প্রান্তে পৌঁছায়। মূলত, এটি এক ধরনের তারযুক্ত সংযোগ। অনেকটা দুটো টিনের ক্যানের মধ্যে সুতা দিয়ে তৈরি খেলনা টেলিফোনের মতো, শুধু আরও অনেক উন্নত।
মোবাইল ফোন একদম ভিন্ন পদ্ধতিতে কাজ করে। এটি কোনো তার ব্যবহার করে না, বরং তারবিহীন প্রযুক্তি এবং রেডিও তরঙ্গ (Radio Waves) ব্যবহার করে সংকেত পাঠায় ও গ্রহণ করে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আপনি শুধু কথা বলতে পারেন না, ভিডিও চ্যাট করতে পারেন, টেক্সট মেসেজ পাঠাতে পারেন এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন। তবে মোবাইল নেটওয়ার্কের সংকেত দুর্বল হলে কল ড্রপ হওয়ার সমস্যা হতে পারে, যা ল্যান্ডলাইনের ক্ষেত্রে সাধারণত হয় না।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে দুটো ফোনই গুরুত্বপূর্ণ। ল্যান্ডলাইন স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য, অন্যদিকে মোবাইল সুবিধাজনক এবং বহুমুখী কাজ করতে সক্ষম।
মোবাইল ফোন কীভাবে কাজ করে?
তারবিহীন প্রযুক্তির জাদু
আমরা সবসময় তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের (Electromagnetic Waves) সমুদ্রে ভেসে আছি, যদিও সেগুলো আমরা দেখতে পাই না। টেলিভিশন এবং রেডিও সম্প্রচার, রিমোট কন্ট্রোল খেলনা, কর্ডলেস ফোন, এমনকি ওয়্যারলেস ডোরবেল – এসবই তড়িৎচুম্বকীয় শক্তি ব্যবহার করে কাজ করে। এই তরঙ্গ আলোর গতিতে (প্রতি সেকেন্ডে ৩,০০,০০০ কিলোমিটার) অদৃশ্যভাবে শূন্যস্থানে ছুটে চলে। মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক এই তড়িৎচুম্বকীয় শক্তির দ্রুততম বর্ধনশীল উৎস।
মোবাইল কল কীভাবে ভ্রমণ করে?
যখন আপনি মোবাইল ফোনে কথা বলেন, ফোনের ভেতরের একটি ক্ষুদ্র মাইক্রোফোন আপনার কণ্ঠস্বরের ওঠানামা শব্দতরঙ্গকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত করে। এরপর ফোনের ভেতরের একটি মাইক্রোচিপ এই সংকেতগুলোকে সংখ্যার সারিতে (ডিজিটাল ফরম্যাটে) পরিণত করে। এই সংখ্যাগুলো একটি রেডিও তরঙ্গের মধ্যে প্যাক করা হয় এবং ফোনের অ্যান্টেনা সেটি সম্প্রচার করে।

এই রেডিও তরঙ্গ আলোর গতিতে বাতাসে ছুটে গিয়ে নিকটতম মোবাইল টাওয়ার বা ম্যাস্ট-এ পৌঁছায়। ম্যাস্টটি সংকেত গ্রহণ করে এবং সেগুলো তার বেস স্টেশনে (Base Station) পাঠায়। বেস স্টেশন স্থানীয় মোবাইল নেটওয়ার্কের একটি নির্দিষ্ট এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে, যাকে সেল (Cell) বলা হয়।
বেস স্টেশন থেকে কলটি তার গন্তব্যের দিকে পাঠানো হয়। যদি আপনি একই নেটওয়ার্কের অন্য একটি মোবাইল ফোনে কল করেন, তাহলে কলটি গন্তব্য ফোনের নিকটতম বেস স্টেশনে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে সেই ফোনে পৌঁছায়। আর যদি অন্য নেটওয়ার্ক বা ল্যান্ডলাইনে কল করেন, তাহলে কলটি মূল টেলিফোন নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে আরও দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে।
মোবাইল টাওয়ার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রথমে মনে হতে পারে, মোবাইল ফোন দুটো ওয়াকি-টকির মতো সরাসরি একে অপরের সাথে কথা বলতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, একটা এলাকায় যদি অনেকে একসাথে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, তাহলে সবার সংকেত একে অপরের সাথে মিশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। এই কারণেই মোবাইল ফোন অনেক বেশি জটিল এবং উন্নত পদ্ধতিতে কাজ করে।
মোবাইল ফোনের ভেতরে একটি রেডিও ট্রান্সমিটার (Radio Transmitter) থাকে, যা সংকেত পাঠায়, এবং একটি রেডিও রিসিভার (Radio Receiver) থাকে, যা সংকেত গ্রহণ করে। কিন্তু এই ট্রান্সমিটার এবং রিসিভার খুব বেশি শক্তিশালী নয়, অর্থাৎ তারা খুব দূরে সংকেত পাঠাতে পারে না। এটা ত্রুটি নয়, বরং ইচ্ছাকৃত ডিজাইন!
মোবাইল ফোনের কাজ শুধু তার নিকটতম ম্যাস্ট এবং বেস স্টেশনের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা। বেস স্টেশনের কাজ হলো অনেকগুলো দুর্বল সংকেত ধরে সেগুলো সঠিক গন্তব্যে পাঠানো। এজন্যই মোবাইল টাওয়ারগুলো বিশাল, শক্তিশালী অ্যান্টেনাযুক্ত এবং সাধারণত উঁচু ভবন এর ওপর বসানো থাকে।
যদি টাওয়ার না থাকত, তাহলে আমাদের মোবাইল ফোনে বিশাল অ্যান্টেনা এবং প্রচণ্ড শক্তিশালী ব্যাটারি লাগত। সেক্ষেত্রে ফোন আর “মোবাইল” থাকত না! মোবাইল ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিকটতম সেল (যেখানে সংকেত সবচেয়ে শক্তিশালী) খুঁজে নেয় এবং যতটা কম শক্তি দিয়ে সম্ভব ততটা দিয়েই যোগাযোগ স্থাপন করে। এতে ব্যাটারি বেশি সময় চলে এবং অন্য ফোনের সাথে সংকেত মিশে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমে।
সেল (Cell) কী এবং কেন প্রয়োজন?
“সেলফোন” নামের পেছনের কারণটা আসলে খুবই বৈজ্ঞানিক। মোবাইল নেটওয়ার্ক একটি শহর বা এলাকাকে ছোট ছোট ভৌগোলিক অংশে ভাগ করে, যাদের সেল বলা হয়। প্রতিটি সেলের নিজস্ব মাস্ট এবং বেস স্টেশন থাকে এবং সেই সেলের ভেতরে যতগুলো কল হয় বা আসে, সবই ওই বেস স্টেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

সেল ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একসাথে অনেক বেশি কল পরিচালনা করা সম্ভব হয়। কারণ প্রতিটি সেল একই রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি (Frequency) পুনরায় ব্যবহার করতে পারে, যেহেতু সেলগুলো একে অপর থেকে আলাদা। সেল যত বেশি হবে, একসাথে তত বেশি কল সম্ভব। এই কারণেই শহরাঞ্চলে সেলের সংখ্যা বেশি এবং সেলগুলোর আকার ছোট, আর গ্রামাঞ্চলে সেল কম এবং আকারে বড়।
রোমিং (Roaming): চলন্ত অবস্থায় কল
যখন আপনি হাঁটছেন বা গাড়িতে চড়ে এক সেল থেকে আরেক সেলে যাচ্ছেন, তখন আপনার ফোন ক্রমাগত কাছাকাছি টাওয়ারগুলোর সাথে সংকেত আদান-প্রদান করে। ফলে মোবাইল নেটওয়ার্ক সবসময় জানে কোন টাওয়ার আপনার সবচেয়ে কাছে।
যদি আপনি কল করার সময় এক সেল থেকে অন্য সেলে চলে যান, তাহলে কলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক সেল থেকে অন্য সেলে হ্যান্ড অফ (Hand Off) হয়ে যায়, যাতে কলটি বিচ্ছিন্ন না হয়। এই প্রক্রিয়াটি এতই দ্রুত এবং মসৃণ যে আপনি সাধারণত টেরই পান না।
অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল: প্রযুক্তির বিবর্তন
প্রথম দিকের মোবাইল ফোনগুলো অ্যানালগ প্রযুক্তি ব্যবহার করত। অ্যানালগ পদ্ধতিতে আপনার কণ্ঠস্বরের কম্পন সরাসরি বৈদ্যুতিক তরঙ্গে রূপান্তরিত হতো যা অনেকটা টিনের ক্যান টেলিফোনের মতো। কিছু পুরোনো ল্যান্ডলাইন আজও এই পদ্ধতিতে কাজ করে।
বর্তমানে বেশিরভাগ মোবাইল ফোন ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এখানে আপনার কণ্ঠস্বরকে সংখ্যার প্যাটার্নে রূপান্তরিত করা হয় এবং তারপর বাতাসে পাঠানো হয়। ডিজিটাল প্রযুক্তির অনেক সুবিধা আছে:
– মোবাইল ফোনে কম্পিউটারের তথ্য পাঠানো এবং গ্রহণ করা সম্ভব।
– এজন্যই আজকের মোবাইল ফোনে টেক্সট মেসেজ (SMS), ওয়েব পেজ, MP3 মিউজিক ফাইল এবং ডিজিটাল ছবি পাঠানো যায়।
– ডিজিটাল সংকেত এনক্রিপ্ট (Encrypt) করা যায়, অর্থাৎ গাণিতিক কোড দিয়ে স্ক্র্যাম্বল করে নিরাপদ করা যায়। ফলে কেউ আপনার কল সহজে আড়িপাতা করতে পারে না।
– পুরোনো অ্যানালগ ফোনের ক্ষেত্রে এটি বড় সমস্যা ছিল, কারণ মিনি রেডিও রিসিভার দিয়ে যে কেউ সংকেত ধরতে পারত।
ডিজিটাল মোবাইল ফোন অনেক বেশি নিরাপদ এবং শক্তিশালী।
মোবাইল ফোনের বিশ্বব্যাপী প্রভাব
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বিশ্বের মাত্র ১ শতাংশ মানুষের কাছে মোবাইল ফোন ছিল। আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ২০২৪ সালের শেষে মোবাইল সাবস্ক্রিপশনের সংখ্যা ৯.১ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে, যা পৃথিবীর জনসংখ্যার চেয়ে বেশি!
মোবাইল ফোন ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিশাল পরিবর্তন এনেছে। ২০১৬ সালের শেষে মোবাইল ইন্টারনেট ট্রাফিক প্রথমবারের মতো ডেস্কটপ ইন্টারনেট ট্রাফিককে ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সাল নাগাদ বিশ্বের ৯৪.৬ শতাংশ মানুষের কাছে মোবাইল ব্রডব্যান্ড সাবস্ক্রিপশন রয়েছে, যা তারযুক্ত ব্রডব্যান্ডের (মাত্র ১৯.৬ শতাংশ) তুলনায় পাঁচগুণ বেশি।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মোবাইল ফোনের বৃদ্ধি সবচেয়ে নাটকীয়। বর্তমানে মোট সাবস্ক্রিপশনের প্রায় ৮০ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। যেসব দেশে বড় আকারের ল্যান্ডলাইন নেটওয়ার্ক নেই, সেসব দেশে মোবাইল ফোন যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটিয়েছে।
স্মার্টফোন: পকেটে কম্পিউটার
২০০০-এর দশকে মোবাইল ফোন মূলত কথা বলা এবং টেক্সট মেসেজ পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত হতো। অনেকে শুধুমাত্র জরুরি পরিস্থিতির জন্য মোবাইল রাখতেন। আজও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৮০ শতাংশের বেশি জরুরি কল (৯১১) মোবাইল ফোন থেকে করা হয়।
কিন্তু আজকের স্মার্টফোন সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্মার্টফোন আসলে ছোট্ট একটি কম্পিউটার, যার মধ্যে মোবাইল ফোনের সার্কিট যুক্ত করা হয়েছে। আধুনিক স্মার্টফোন দিয়ে ইমেইল পাঠানো, ওয়েব ব্রাউজ করা, মিউজিক ডাউনলোড করা, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা এবং হাজারো অ্যাপ চালানো সম্ভব।
পুরোনো মোবাইল ফোন শুধু মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু স্মার্টফোন প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ওয়াই-ফাইয়ের মধ্যে সুইচ করতে পারে। পুরোনো মোবাইল ফোন ছিল মূলত “বেতার টেলিফোন”, কিন্তু আধুনিক স্মার্টফোন পকেটের কম্পিউটার, যা ফোন কলও করতে পারে।
মোবাইল ফোনের ভেতরে কী আছে?
একটি আধুনিক স্মার্টফোনের ভেতরে অনেক জটিল উপাদান থাকে:
– টাচস্ক্রিন: পুরোনো ফোনে কীবোর্ড এবং ছোট LCD স্ক্রিন ছিল, কিন্তু স্মার্টফোনে টাচস্ক্রিনই কীবোর্ডের কাজ করে।
– প্রসেসর চিপ: স্মার্টফোনে কোয়াড-কোর বা অক্টা-কোর প্রসেসর থাকে, যা দ্রুত হিসাব এবং মাল্টিটাস্কিং করতে পারে।
– ক্যামেরা: আজকের স্মার্টফোনে ১৩ থেকে ১০৮ মেগাপিক্সেল পর্যন্ত ক্যামেরা থাকে।
– ব্যাটারি: লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়, যার ক্যাপাসিটি ৩০০০ থেকে ৭০০০ mAh পর্যন্ত হতে পারে।
– অ্যান্টেনা: আধুনিক ফোনে অ্যান্টেনা ফোনের বডির ভেতরেই লুকানো থাকে।
– NFC চিপ: কন্টাক্টলেস পেমেন্টের জন্য।
– মাইক্রোফোন এবং স্পিকার: কথা বলা এবং শোনার জন্য।
– SIM কার্ড স্লট: নেটওয়ার্ক সংযোগের জন্য।
– সেন্সর: জাইরোস্কোপ, অ্যাক্সিলারোমিটার, প্রক্সিমিটি সেন্সর ইত্যাদি।
এই সব উপাদান মিলিয়ে একটি স্মার্টফোন একইসাথে টেলিফোন, ক্যামেরা, MP3 প্লেয়ার, GPS নেভিগেটর এবং কম্পিউটার হিসেবে কাজ করতে পারে।
মোবাইল ফোনের ইতিহাস
মোবাইল ফোনের আবিষ্কার একদিনে হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বহু বিজ্ঞানী এবং উদ্ভাবকের অবদান:
১৮৭৩: ব্রিটিশ পদার্থবিদ জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল তড়িৎচুম্বকত্বের তত্ত্ব প্রকাশ করেন।
১৮৭৬: স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী উদ্ভাবক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোন আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে তিনি ফটোফোন নামে একটি যন্ত্র তৈরি করেন, যা আলোক রশ্মি ব্যবহার করে ফোন কল পাঠাত এবং গ্রহণ করত, এটি মূলত আধুনিক মোবাইল ফোনের সুদূর পূর্বপুরুষ।
১৮৮৮: জার্মান পদার্থবিদ হাইনরিখ হার্টজ তাঁর ল্যাবে প্রথম তড়িৎচুম্বকীয় রেডিও তরঙ্গ তৈরি করেন।
১৮৯৯: ইতালীয় উদ্ভাবক গুগলিয়েলমো মার্কনি ইংলিশ চ্যানেল জুড়ে রেডিও তরঙ্গ পাঠান। ১৯০১ সালে মার্কনি ইংল্যান্ডের কর্নওয়াল থেকে নিউফাউন্ডল্যান্ডে রেডিও তরঙ্গ পাঠাতে সফল হন। মার্কনি রেডিওর জনক হিসেবে স্মরণীয়।
১৯০৬: আমেরিকান প্রকৌশলী রেজিনাল্ড ফেসেন্ডেন প্রথম রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে মানুষের কণ্ঠস্বর প্রেরণ করেন।
১৯৭৩: মার্টিন কুপার, মোটোরোলার একজন প্রকৌশলী, প্রথম মোবাইল ফোন কল করেন। তাঁর প্রোটোটাইপ DynaTAC ফোনের ওজন ছিল ২৮ পাউন্ড (প্রায় ১৩ কেজি)!
১৯৭৫: মার্টিন কুপার এবং তাঁর সহকর্মীরা তাদের রেডিও টেলিফোন সিস্টেমের জন্য পেটেন্ট লাভ করেন।
১৯৮৪: মোটোরোলা DynaTAC বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক হ্যান্ডহেল্ড মোবাইল ফোন হিসেবে বাজারে আসে।
২০০৭: অ্যাপলের আইফোন মোবাইল ফোনের জগতে বিপ্লব ঘটায়। এটি মূলত একটি টাচ-কন্ট্রোলড মিনি কম্পিউটার ছিল, যা সাধারণ মোবাইল ফোনের মতো ছোট।
২০২৪: মোবাইল সাবস্ক্রিপশন ৯.১ বিলিয়নে পৌঁছায়, যার প্রায় ৮০ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।
কী শিখলাম?
মোবাইল ফোনের গল্প আসলে মানব সভ্যতার এক অসাধারণ অর্জনের গল্প। রেডিও তরঙ্গ, তড়িৎচুম্বকীয় শক্তি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচার—এসবের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এই ক্ষুদ্র যন্ত্র, যা আজ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেল নেটওয়ার্কের চতুর ডিজাইন, যেখানে একটি এলাকাকে ছোট ছোট সেলে ভাগ করে লাখো কল একসাথে পরিচালনা করা সম্ভব হয়, তা প্রকৌশলের এক অনন্য নিদর্শন।
আজকের স্মার্টফোন শুধু ফোন নয়, বরং পকেটে রাখা এক শক্তিশালী কম্পিউটার, যা আমাদের যোগাযোগ, শিক্ষা, বিনোদন এবং ব্যবসার ধরন সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। মোবাইল ফোনের এই বিবর্তনের পেছনে রয়েছে শত শত বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং উদ্ভাবকের কঠোর পরিশ্রম ও সৃজনশীলতা। তাঁদের অবদানের জন্য আজ আমরা এই অসাধারণ প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারছি।