আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ব্যবহৃত ইন্টারনেটের পেছনের গল্প এবং এর কার্যপ্রণালী

ইন্টারনেট আসলে কী?
আজকের ডিজিটাল যুগে আমরা প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করি। ভিডিও দেখি, বন্ধুদের সাথে চ্যাট করি, পড়াশোনা করি কিংবা নতুন কিছু শিখি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই ইন্টারনেট জিনিসটা আসলে কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ইন্টারনেট হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি কম্পিউটারের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সব কম্পিউটার পরস্পরের সাথে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। একে অনেক সময় “নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক” বলা হয়, কারণ এটি মূলত অসংখ্য ছোট ছোট নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত।
ইন্টারনেট হলো ওয়েব (Web)-এর মূল ভিত্তি। অনেকে ইন্টারনেট আর ওয়েবকে একই জিনিস মনে করেন, কিন্তু আসলে তা নয়। ইন্টারনেট হলো প্রযুক্তিগত অবকাঠামো যা কম্পিউটারগুলোকে সংযুক্ত করে। আর ওয়েব হলো এই অবকাঠামোর উপর তৈরি একটি সেবা, যেখানে আমরা ওয়েবসাইট ব্রাউজ করি। ইন্টারনেটের উপর আরও অনেক সেবা আছে যেমন ইমেইল, ভিডিও কল, অনলাইন গেমিং ইত্যাদি।
ইন্টারনেটের ইতিহাস
ইন্টারনেটের ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। এটি শুরু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে, যখন আমেরিকান সেনাবাহিনীর অর্থায়নে একটি গবেষণা প্রকল্প চালু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকে বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি কোম্পানির সহায়তায় এটি একটি পাবলিক অবকাঠামোতে রূপান্তরিত হয়। সময়ের সাথে সাথে ইন্টারনেটকে সমর্থনকারী প্রযুক্তিগুলো অনেক উন্নত হয়েছে, কিন্তু মূল কার্যপ্রণালী প্রায় একই রয়ে গেছে। এর মূল কাজ হচ্ছে কম্পিউটারগুলোকে সংযুক্ত রাখা এবং যা-ই ঘটুক না কেন, সেগুলোকে সংযুক্ত থাকার একটি উপায় খুঁজে দেওয়া।
ছোট নেটওয়ার্ক থেকে বিশাল ইন্টারনেট
সহজ নেটওয়ার্ক
ধরুন, দুটি কম্পিউটারকে যদি একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে হয়, তাহলে তাদের সংযুক্ত করতে হবে, হয় তার দিয়ে (যেমন ইথারনেট ক্যাবল) অথবা বেতার মাধ্যমে (যেমন ওয়াই-ফাই বা ব্লুটুথ)। আধুনিক সব কম্পিউটারই এই ধরনের সংযোগ স্থাপন করতে পারে।
এই নেটওয়ার্ক শুধু দুটি কম্পিউটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আপনি যতগুলো খুশি কম্পিউটার যুক্ত করতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা দ্রুত জটিল হয়ে পড়ে। যদি আপনি দশটি কম্পিউটার সংযুক্ত করতে চান, তাহলে আপনার দরকার ৪৫টি ক্যাবল এবং প্রতিটি কম্পিউটারে ৯টি করে প্লাগ! বেশ ঝামেলার, তাই না?
সুইচের ব্যবহার
এই সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবহার করা হয় একটি বিশেষ ছোট কম্পিউটার, যার নাম নেটওয়ার্ক সুইচ। সুইচের একটাই কাজ যা রেলওয়ে স্টেশনের সিগন্যালম্যানের মতো, এটি নিশ্চিত করে যে একটি নির্দিষ্ট কম্পিউটার থেকে পাঠানো বার্তা শুধুমাত্র তার গন্তব্য কম্পিউটারে পৌঁছায়। যদি কম্পিউটার A, কম্পিউটার B কে কোনো বার্তা পাঠায়, তাহলে সেটি প্রথমে সুইচে যায়, এবং সুইচ সেটি B এর কাছে পৌঁছে দেয়। এতে অন্য কম্পিউটারগুলো সেই বার্তা পায় না।
একটি সুইচ যোগ করলে, দশটি কম্পিউটারের নেটওয়ার্কের জন্য মাত্র দশটি ক্যাবল দরকার, প্রতিটি কম্পিউটারের জন্য একটি করে এবং সুইচে দশটি প্লাগ।
রাউটার এবং বড় নেটওয়ার্ক
কিন্তু শত, হাজার, কোটি কম্পিউটার সংযুক্ত করবেন কীভাবে? একটি সুইচ তো এতদূর যেতে পারবে না। তবে মজার ব্যাপার হলো, সুইচও একটি কম্পিউটারের মতো। তাহলে দুটি সুইচকে একসাথে সংযুক্ত করতে বাধা কোথায়? কিছুই না!
তবে বাস্তবে, এভাবে অসংখ্য সুইচ সংযুক্ত করলে প্রযুক্তিগত অনেক সমস্যা দেখা দেয়। যত বেশি সুইচের মধ্য দিয়ে ডেটা যেতে হয়, তত বেশি সময় লাগে। আর যদি কোনো একটি সুইচ নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে পুরো নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

এই সমস্যার সমাধান হলো প্রতিটি স্থানীয় নেটওয়ার্ককে ছোট রাখা এবং এই স্থানীয় নেটওয়ার্কগুলোকে একটি বিশেষ ডিভাইস দিয়ে সংযুক্ত করা যার নাম রাউটার (Router)। রাউটার এমন একটি কম্পিউটার যা জানে কীভাবে বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মধ্যে বার্তা প্রেরণ করতে হয়। রাউটার একটি পোস্ট অফিসের মতো কাজ করে। যখন কোনো প্যাকেট আসে, সে ঠিকানা পড়ে এবং সরাসরি সঠিক গন্তব্যে পাঠিয়ে দেয়।
টেলিফোন নেটওয়ার্ক এবং মডেম
আমাদের নেটওয়ার্ককে টেলিফোন অবকাঠামোর সাথে সংযুক্ত করতে আমাদের দরকার একটি বিশেষ যন্ত্র বা মডেম (Modem)। মডেম আমাদের নেটওয়ার্কের তথ্যকে টেলিফোন অবকাঠামোর জন্য উপযুক্ত তথ্যে রূপান্তরিত করে এবং বিপরীতভাবেও কাজ করে।
বাড়িতে আমরা যে রাউটার ব্যবহার করি, সেটি সাধারণত একটি সুইচ, একটি রাউটার এবং একটি মডেম এই তিনটির সমন্বয়ে তৈরি একটি ডিভাইস।
ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ISP)
টেলিফোন অবকাঠামোর সাথে সংযুক্ত হওয়ার পর, আমাদের নেটওয়ার্ক থেকে যেকোনো গন্তব্যে বার্তা পাঠাতে হলে আমাদের সংযুক্ত হতে হয় একটি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ISP)-এর সাথে। ISP হলো এমন একটি কোম্পানি যা কিছু বিশেষ রাউটার পরিচালনা করে, যেগুলো একে অপরের সাথে সংযুক্ত এবং অন্য ISP-দের রাউটারের সাথেও যুক্ত। এভাবে আমাদের নেটওয়ার্ক থেকে বার্তা বিভিন্ন ISP-এর নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে গন্তব্য নেটওয়ার্কে পৌঁছায়। ইন্টারনেট মূলত এই পুরো নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর সমষ্টি।
ইন্টারনেটের মূল অংশগুলো কী কী?
যাতে আমরা আমাদের প্রিয় ওয়েবসাইটগুলো দেখতে পারি, এর জন্য দরকার:
সার্ভার (Server): এগুলো তথ্য ধারণ করে এবং শেয়ার করে, যেমন ওয়েবসাইট কোথায় আছে এবং ওয়েবপেজ তৈরি করার ডেটা।
ক্লায়েন্ট (Client): এগুলো হলো যেসব ডিভাইস আমরা ওয়েবপেজ দেখতে ব্যবহার করি, যেমন কম্পিউটার, ফোন, ট্যাবলেট।
কানেকশন: এগুলো তথ্যকে বিভিন্ন ডিভাইসের মধ্যে যাতায়াত করতে দেয়।
রাউটার: এগুলো নিশ্চিত করে যে তথ্য ইন্টারনেটে সঠিক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে।
কম্পিউটার খুঁজে বের করা: IP অ্যাড্রেস এবং ডোমেইন নেম
আপনি যদি কোনো কম্পিউটারে বার্তা পাঠাতে চান, তাহলে আপনাকে নির্দিষ্ট করতে হবে কোনটিতে। এজন্য নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত প্রতিটি কম্পিউটারের একটি অনন্য ঠিকানা থাকে, যাকে বলা হয় “আইপি অ্যাড্রেস” (IP Address, যেখানে IP মানে Internet Protocol)। এটি চারটি সংখ্যার একটি সিরিজ যা ডট দিয়ে আলাদা করা থাকে, যেমন: 192.0.2.172।
কম্পিউটারের জন্য এটি ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের মতো মানুষের জন্য এই ধরনের ঠিকানা মনে রাখা কঠিন। বিষয়টি সহজ করতে, আমরা একটি IP অ্যাড্রেসকে মানুষের পড়ার উপযোগী একটি নাম দিয়ে চিহ্নিত করতে পারি, যাকে বলা হয় ডোমেইন নেম (Domain Name)। উদাহরণস্বরূপ, google.com হলো একটি ডোমেইন নেম যা IP অ্যাড্রেস 142.250.190.78-এর উপরে ব্যবহৃত হয়। তাই ডোমেইন নেম ব্যবহার করা আমাদের জন্য ইন্টারনেটে কোনো কম্পিউটারে পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ উপায়।
তথ্য কীভাবে যাতায়াত করে?
মনে করুন, আপনি একটি ওয়েবসাইটের লিংকে ক্লিক করলেন বা কোনো ছবি ডাউনলোড করতে চাইলেন। এটি আপনার কম্পিউটার থেকে একটি সার্ভারে একটি বার্তা পাঠায়, যা ওয়েবপেজের একটি কপি চায়।
ডেটা প্যাকেটে ভাগ করা

তথ্যটি একসাথে পাঠানোর জন্য অনেক বড়, তাই এটিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা হয়। এগুলোকে বলা হয় ডেটা প্যাকেট (Data Packets)। রাউটারগুলো নিশ্চিত করে যে সব ডেটা প্যাকেট সঠিক কম্পিউটারে পাঠানো হয়েছে।
তথ্য পুনরায় সাজানো
পাঠানোর আগে সব ডেটা প্যাকেটকে একটি নম্বর দেওয়া হয়। কম্পিউটার এই নম্বরগুলো ব্যবহার করে তথ্যকে সঠিক ক্রমে সাজায়। তারপর ওয়েব ব্রাউজার আপনাকে ওয়েবপেজটি দেখায়।
আপনি প্রতিবার যখন ইন্টারনেটে নতুন তথ্য চান, তখনই এই প্রক্রিয়া ঘটে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে!
ইন্ট্রানেট এবং এক্সট্রানেট
ইন্টারনেটের পাশাপাশি আরও দুটি ধরনের নেটওয়ার্ক আছে:
ইন্ট্রানেট (Intranet): এগুলো হলো ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক যা একটি নির্দিষ্ট সংস্থার সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এগুলো সাধারণত সদস্যদের নিরাপদভাবে তথ্য শেয়ার করতে, সহযোগিতা করতে এবং যোগাযোগ করতে ব্যবহৃত হয়। যেমন, একটি প্রতিষ্ঠানের ইন্ট্রানেট বিভাগীয় তথ্য, নথি ব্যবস্থাপনা এবং আলোচনার জন্য ব্যবহার করা হয়।
এক্সট্রানেট (Extranet): এগুলো ইন্ট্রানেটের মতোই, তবে এগুলো অন্যান্য সংস্থার সাথে শেয়ার এবং সহযোগিতার জন্য একটি ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের সম্পূর্ণ বা আংশিক অংশ খুলে দেয়। এগুলো সাধারণত ক্লায়েন্ট এবং স্টেকহোল্ডারদের সাথে নিরাপদভাবে তথ্য শেয়ার করতে ব্যবহৃত হয়।
উভয় ইন্ট্রানেট এবং এক্সট্রানেট ইন্টারনেটের মতো একই ধরনের অবকাঠামোতে চলে এবং একই প্রোটোকল ব্যবহার করে। তাই অনুমোদিত সদস্যরা বিভিন্ন শারীরিক অবস্থান থেকে এগুলো অ্যাক্সেস করতে পারে।
কী শিখলাম?
ইন্টারনেট আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, কিন্তু এর পেছনের প্রযুক্তিটি বোঝা অনেকের কাছেই রহস্যময় মনে হয়। আসলে, মূল ধারণাটি বেশ সহজ। ইন্টারনেট এর কাজ হচ্ছে কোটি কোটি কম্পিউটারকে সংযুক্ত করা এবং তাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব করা। সুইচ, রাউটার, মডেম, ISP এই প্রতিটি উপাদান মিলে তৈরি করেছে এই বিস্ময়কর প্রযুক্তি। পরের বার যখন আপনি কোনো ওয়েবসাইট ব্রাউজ করবেন, একটু থামুন এবং ভাবুন কত দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে আপনার বার্তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য রাউটারের মধ্য দিয়ে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে। ইন্টারনেট শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি মানুষের সৃজনশীলতা এবং সহযোগিতার এক অসাধারণ নিদর্শন।