জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে আপনার অবস্থান নির্ণয়ের বিস্ময়কর বিজ্ঞান
নতুন কোনো রেস্তোরাঁয় যাওয়ার পথ খুঁজছেন? কিংবা অপরিচিত শহরে হারিয়ে গেছেন? এমন পরিস্থিতিতে আপনার স্মার্টফোন বা গাড়ির জিপিএস ডিভাইস যেন জাদুর মতো বলে দেয় আপনি ঠিক কোথায় আছেন। কিন্তু এই জাদুর পেছনের বিজ্ঞান আসলে কী? চলুন জেনে নেওয়া যাক কীভাবে জিপিএস প্রযুক্তি আপনার অবস্থান নির্ণয় করে।
জিপিএস আসলে কী?
জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (Global Positioning System) হলো একটি উপগ্রহভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা। এর পুরো নাম NAVSTAR Global Positioning System। বর্তমানে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে ৩১টি সক্রিয় জিপিএস উপগ্রহ, ৯টি রিজার্ভে আছে এবং ২টি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। এই উপগ্রহগুলো এমনভাবে সাজানো যে পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে কমপক্ষে চারটি উপগ্রহের সংকেত পাওয়া যায়।
মজার ব্যাপার হলো, এখন পর্যন্ত ৩০টি উপগ্রহ অবসর নিয়েছে এবং ২টি উৎক্ষেপণের সময় হারিয়ে গেছে। প্রতিটি উপগ্রহকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর নতুন উপগ্রহ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হয়।
জিপিএসের ইতিহাস
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ ১৯৭০-এর দশকে সামরিক ব্যবহারের জন্য জিপিএস তৈরি করে। ১৯৮৩ সাল থেকে এটি আংশিকভাবে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং ২০০০ সাল থেকে জিপিএস রিসিভার রয়েছে এমন যে কেউ বিনা বাধায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছেন।
জিপিএসের মতো আরও কি সিস্টেম আছে?
জিপিএস একমাত্র ব্যবস্থা নয়। চীন তৈরি করেছে বেইডু-৩ (BeiDou-3) সিস্টেম, ইউরোপীয় ইউনিয়ন চালু করেছে গ্যালিলিও (Galileo) এবং রাশিয়ার রয়েছে গ্লোনাস (GLONASS – Globalnaya Navigatsionnaya Sputnikovaya Sistema)। এই সবগুলোই জিএনএসএস (GNSS – Global Navigation Satellite System) এর উদাহরণ, যা মহাকাশ থেকে সংকেত পাঠিয়ে পৃথিবীর যেকোনো স্থানে অবস্থান ও সময় নির্ণয় করতে সাহায্য করে।
কীভাবে কাজ করে জিপিএস?
আসলে প্রক্রিয়াটি খুবই সহজ। আপনার মোবাইল ফোনের জিপিএস রিসিভার মহাকাশে থাকা জিপিএস উপগ্রহগুলো থেকে রেডিও সংকেত গ্রহণ করে। এই সংকেতে উপগ্রহের অবস্থান এবং সংকেত পাঠানোর সময় এনকোড করা থাকে। সংকেত আসতে যে সময় লাগে এবং উপগ্রহের অবস্থানের ভিত্তিতে ফোন হিসাব করে নেয় আপনি কোথায় আছেন এবং সেটি ফোনে সংরক্ষিত মানচিত্রে দেখায়।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আপনার ফোন জিপিএস উপগ্রহে কিছু পাঠায় না। এটি শুধু সংকেত গ্রহণ করে। এজন্যই আপনি অফলাইনেও নেভিগেশন ব্যবহার করতে পারেন। অবশ্য যখন আপনি অনলাইন থাকেন, তখন ফোন আপডেট মানচিত্র ডাউনলোড করতে পারে, রিয়েল-টাইম ট্রাফিক তথ্য পেতে পারে এবং আপনার অবস্থান ম্যাপ প্রদানকারী বা মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রদানকারীর কাছে পাঠাতে পারে।
ট্রাইল্যাটারেশন: অবস্থান নির্ণয়ের মূল কৌশল

জিপিএস প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো ট্রাইল্যাটারেশন (Trilateration) নামক একটি গাণিতিক পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে জানা কয়েকটি বিন্দু থেকে দূরত্বের ভিত্তিতে অজানা বিন্দুর অবস্থান নির্ণয় করা হয়।
আপনার ডিভাইসের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য কমপক্ষে তিনটি জিপিএস উপগ্রহের সংকেত প্রয়োজন, তবে আরও নিখুঁত অবস্থান এবং উচ্চতা জানার জন্য চারটি উপগ্রহ দরকার। প্রতিটি উপগ্রহ রেডিও সংকেত পাঠায় যাতে তার নিজের অবস্থান এবং সংকেত পাঠানোর সময় থাকে।
কীভাবে হিসাব করা হয় দূরত্ব?

জিপিএস রিসিভার উপগ্রহ থেকে সংকেত পেয়ে হিসাব করে সংকেত আসতে কতটা সময় লেগেছে। এটি করা হয় উপগ্রহের সংকেতে এনকোড করা প্রেরণের সময়ের সাথে রিসিভারের ঘড়ি অনুযায়ী সংকেত পৌঁছানোর সময় তুলনা করে। যেহেতু রেডিও সংকেত আলোর গতিতে ভ্রমণ করে (প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড), তাই উপগ্রহ এবং রিসিভারের মধ্যে দূরত্ব খুব নিখুঁতভাবে হিসাব করা যায়।
ট্রাইল্যাটারেশন প্রক্রিয়া বিস্তারিত
ধরুন, আপনি উপগ্রহ A থেকে ‘a’ দূরত্বে আছেন। তাহলে আপনি A উপগ্রহকে কেন্দ্র করে ‘a’ ব্যাসার্ধের একটি কাল্পনিক গোলকের পৃষ্ঠে আছেন বলে ভাবতে পারেন। এবার উপগ্রহ B থেকে ‘b’ দূরত্বে থাকলে আরেকটি গোলক আঁকা যায়। এই দুটি গোলক একে অপরকে ছেদ করে একটি বৃত্ত তৈরি করে।
আরও নিখুঁত অবস্থান পেতে তৃতীয় উপগ্রহ C প্রয়োজন, যার থেকে আপনি ‘c’ দূরত্বে। তিনটি গোলকের ছেদ ঘটে মাত্র দুটি বিন্দুতে, যার একটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে এবং সেটিই আপনার অবস্থান। এজন্যই তিনটি উপগ্রহ সাধারণত দ্রাঘিমাংশ ও অক্ষাংশ নির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট। চতুর্থ উপগ্রহ আরও নিখুঁততা এবং উচ্চতার তথ্য প্রদান করে।
যত বেশি উপগ্রহের সংকেত পাওয়া যায়, অবস্থান নির্ণয় তত নিখুঁত হয়। এজন্যই পৃথিবীর প্রতিটি স্থান কমপক্ষে চারটি উপগ্রহ দিয়ে কভার করা হয়।
কী কী বিষয় জিপিএসের নিখুঁততা প্রভাবিত করে?
জিপিএস যদিও অবিশ্বাস্য নিখুঁত, তবুও কিছু বিষয় এর যথার্থতাকে প্রভাবিত করতে পারে। উঁচু ভবন, গাছপালা এবং অন্যান্য বাধা জিপিএস উপগ্রহের সংকেত আটকে দিতে পারে, যা অবস্থান নির্ণয়ে ভুল তৈরি করে। এছাড়া বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা এবং আপনার অবস্থানের সাপেক্ষে উপগ্রহগুলোর জ্যামিতিক অবস্থানও নিখুঁততাকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভবিষ্যতের জিপিএস প্রযুক্তি
প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, জিপিএসও বিকশিত হচ্ছে। উপগ্রহ প্রযুক্তির অগ্রগতি, উন্নত অ্যালগরিদম এবং পরিপূরক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থার সংযোজন আগামী বছরগুলোতে জিপিএসের নিখুঁততা ও নির্ভরযোগ্যতা আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
কী শিখলাম?
জিপিএস প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এতটাই মিশে গেছে যে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই এর পেছনে কত জটিল বিজ্ঞান ও গণিত কাজ করছে। মহাকাশে ঘুরতে থাকা উপগ্রহগুলো থেকে আলোর গতিতে আসা সংকেত, ট্রাইল্যাটারেশনের গাণিতিক হিসাব এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি হয় এই অবিশ্বাস্য ব্যবস্থা। পরের বার যখন আপনার ফোন বলবে আপনি কোথায় আছেন, মনে রাখবেন এটি শুধু প্রযুক্তি নয়, এটি বিজ্ঞানের এক অসাধারণ অর্জন।
সূত্র: মিরেও ব্লগ, প্রোথেলিস