ফোটোভোল্টাইক প্রযুক্তির মাধ্যমে সূর্যালোক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্পূর্ণ বিজ্ঞান

প্রতিদিন সূর্য আমাদের পৃথিবীতে অসীম শক্তি পাঠাচ্ছে। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারি, যা পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই। কিন্তু সূর্যের আলো কীভাবে আমাদের ঘরের বাতি জ্বালায় বা মোবাইল চার্জ করে? চলুন জেনে নেই সৌরশক্তির পুরো বিজ্ঞানটা।
সৌরশক্তি কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
সৌরশক্তি হলো সূর্য থেকে পাওয়া শক্তি, যা দুটি প্রধান রূপে ব্যবহার করা হয় – বিদ্যুৎ এবং তাপ। সৌর প্যানেল ব্যবহার করে এই শক্তি সংগ্রহ করা হয়, যা বাড়ির ছাদ থেকে শুরু করে বিশাল সৌর খামার পর্যন্ত বিভিন্ন আকারে পাওয়া যায়। সৌরশক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি একটি নবায়নযোগ্য এবং পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎস। যতদিন সূর্য থাকবে, ততদিন এই শক্তি পাওয়া যাবে এবং এটি কোনো ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে না।
সৌর প্যানেলের কার্বন ফুটপ্রিন্ট অত্যন্ত কম, কারণ একটি প্যানেল ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করতে পারে। তাছাড়া, প্যানেলে ব্যবহৃত উপকরণগুলো ক্রমশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠছে, ফলে ভবিষ্যতে এর পরিবেশগত প্রভাব আরও কমবে।
সৌরশক্তির ইতিহাস: প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ
মানুষ সৌরশক্তি ব্যবহার করছে হাজার বছর ধরে। খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীতে মানুষ চকচকে বস্তুতে সূর্যের রশ্মি প্রতিফলিত করে আগুন জ্বালাতো। খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীতে গ্রিক এবং রোমানরা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মশাল জ্বালাতে আয়না দিয়ে সূর্যালোক কেন্দ্রীভূত করতো।
আধুনিক সৌরশক্তির জন্ম হয় ১৮৩৯ সালে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ফরাসি পদার্থবিদ এডমন্ড বেকেরেল ফোটোভোল্টাইক প্রভাব আবিষ্কার করেন। ধাতব ইলেকট্রোড দিয়ে একটি সেল নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন যে আলোর উপস্থিতিতে সেলটি বেশি বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে।
তবে বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য সৌরসেল তৈরি হয় ১৯৫৪ সালে। বেল ল্যাবরেটরিতে ড্যারিল চ্যাপিন, ক্যালভিন ফুলার এবং জেরাল্ড পিয়ারসন সিলিকন দিয়ে প্রথম ফোটোভোল্টাইক সেল তৈরি করেন, যা সূর্যের শক্তিকে দৈনন্দিন যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য যথেষ্ট বিদ্যুতে রূপান্তর করতে পারতো। ১৯৫০-এর দশকের শেষদিকে থেকে মার্কিন মহাকাশ স্যাটেলাইটগুলো সৌরশক্তি দিয়ে চলতে শুরু করে। আজও পৃথিবীর কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান স্যাটেলাইট এবং মহাকাশযানগুলো সৌরশক্তিতে চলে।
সৌরসেল কীভাবে কাজ করে: ফোটন থেকে বিদ্যুৎ
সৌর প্যানেল সাধারণত সিলিকন বা অন্য কোনো সেমিকন্ডাক্টর পদার্থ দিয়ে তৈরি, যা ধাতব ফ্রেমে কাচের আবরণে বসানো থাকে। যখন সূর্যের আলোর ফোটন (আলোর ক্ষুদ্র শক্তির প্যাকেট) এই সেমিকন্ডাক্টর পদার্থে আঘাত করে, তখন তিনটি জিনিসের একটি ঘটতে পারে: ফোটন সেল থেকে প্রতিফলিত হবে, সেলের ভেতর দিয়ে চলে যাবে, অথবা সেমিকন্ডাক্টর পদার্থ দ্বারা শোষিত হবে। শুধুমাত্র শোষিত ফোটনগুলোই বিদ্যুৎ তৈরিতে সাহায্য করে।

যখন পর্যাপ্ত সূর্যালোক শোষিত হয়, তখন পদার্থের পরমাণু থেকে ইলেকট্রন মুক্ত হয়। উৎপাদনের সময় সৌরসেলের সামনের পৃষ্ঠকে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যাতে এই মুক্ত ইলেকট্রনগুলো স্বাভাবিকভাবেই সেলের সামনের দিকে চলে আসে।
ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রনগুলো যখন সেলের সামনের পৃষ্ঠে জমা হয়, তখন সেলের সামনে এবং পিছনে বৈদ্যুতিক চার্জের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়। এই ভারসাম্যহীনতা একটি ভোল্টেজ সম্ভাবনা তৈরি করে, ঠিক যেমন ব্যাটারির ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক প্রান্ত। সেলের উপরে থাকা বৈদ্যুতিক পরিবাহী এই ইলেকট্রনগুলো সংগ্রহ করে। যখন এই পরিবাহীগুলো একটি বৈদ্যুতিক সার্কিটের মাধ্যমে কোনো যন্ত্রের সাথে সংযুক্ত হয়, তখন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়।
সৌরসেল, প্যানেল এবং অ্যারে: ছোট থেকে বড়
একটি সৌরসেল হলো সৌরশক্তি ব্যবস্থার মূল একক। একটি সেলের আকার ০.৫ ইঞ্চি থেকে প্রায় ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। তবে একটি সেল মাত্র ১ থেকে ২ ওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে, যা শুধু ক্যালকুলেটর বা হাতঘড়ি চালানোর জন্য যথেষ্ট।
বেশি বিদ্যুৎ পেতে অনেকগুলো সেল একসাথে জুড়ে আবহাওয়া-প্রতিরোধী প্যানেল বা মডিউল তৈরি করা হয়। একটি প্যানেলে যত বেশি সেল থাকবে বা যত বেশি পৃষ্ঠতল থাকবে, তত বেশি বিদ্যুৎ তৈরি হবে। আবার অনেকগুলো প্যানেল একসাথে জুড়ে সৌর অ্যারে তৈরি করা হয়। একটি অ্যারেতে মাত্র দুটি প্যানেল থেকে শুরু করে কয়েক শত প্যানেল পর্যন্ত থাকতে পারে।
ডিসি থেকে এসি: ইনভার্টারের ভূমিকা

সৌরসেল সরাসরি কারেন্ট বা ডিসি (DC) বিদ্যুৎ তৈরি করে। ডিসি বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করা যায় এবং ডিসি যন্ত্রপাতি চালানো যায়। কিন্তু আমাদের ঘরবাড়িতে যে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়, তা হলো পরিবর্তী কারেন্ট বা এসি (AC)। তাই সৌর প্যানেল থেকে আসা ডিসি বিদ্যুৎকে ইনভার্টার নামক যন্ত্র দিয়ে এসিতে রূপান্তরিত করা হয়, যাতে তা সাধারণ বৈদ্যুতিক সকেটে ব্যবহার করা যায়।
সৌর ফোটোভোল্টাইক বনাম সৌর তাপীয় প্যানেল
দুই ধরনের সৌর প্যানেল রয়েছে এবং তাদের কাজ ভিন্ন। সৌর ফোটোভোল্টাইক (PV) প্যানেল বিদ্যুৎ তৈরি করে, যা আমরা এতক্ষণ আলোচনা করলাম। অন্যদিকে সৌর তাপীয় প্যানেল তাপ উৎপন্ন করে। যদিও উভয়েরই শক্তির উৎস সূর্য, তবে প্রযুক্তি সম্পূর্ণ আলাদা।
সৌর PV ফোটোভোল্টাইক প্রভাবের উপর ভিত্তি করে কাজ করে, যেখানে আলোর ফোটন সেমিকন্ডাক্টর পৃষ্ঠে আঘাত করে ইলেকট্রন মুক্ত করে। সৌর তাপীয় অনেক সহজ – এটি সরাসরি সূর্যালোক দিয়ে পানি (বা অন্য তরল) গরম করে। বাড়িতে সৌর তাপীয় প্যানেল ছাদে বসিয়ে গরম পানি তৈরি করা হয়। বড় পরিসরে সৌর তাপীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও ব্যবহার করা হয়।
সৌর খামার: বিশাল বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র
সৌর খামার বা সৌর পার্ক হলো বিশাল জমিতে অসংখ্য সৌর প্যানেল একসাথে স্থাপন করা, যাতে একসাথে প্রচুর পরিমাণ সৌরশক্তি সংগ্রহ করা যায়। এই খামারগুলো বড় আকারে বিদ্যুৎ তৈরি করে এবং সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে। এটি একক বাড়ির ছাদের সৌর প্যানেলের চেয়ে আলাদা, যা সাধারণত শুধু সেই বাড়ি বা ভবনে ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ তৈরি করে।
মেঘলা দিনেও কি সৌরশক্তি পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, সম্ভব! সৌর প্যানেল কাজ করার জন্য শুধু কিছুটা দিনের আলো প্রয়োজন, সরাসরি সূর্যালোক বাধ্যতামূলক নয়। তবে মেঘলা দিনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার কমে যায়। উৎপাদন নির্ভর করে সরাসরি সূর্যালোকের পরিমাণ, প্যানেলের মান, সংখ্যা এবং অবস্থানের উপর।
সৌর প্যানেল সবচেয়ে ভালো কাজ করে যখন সরাসরি সূর্যের দিকে মুখ করা থাকে। কিছু সিস্টেমে ট্র্যাকিং যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, যা সূর্যের গতিবিধি অনুসরণ করে প্যানেল ঘুরিয়ে দেয়, কিন্তু এগুলো ব্যয়বহুল। বেশিরভাগ সিস্টেমে প্যানেলগুলো স্থির থাকে এবং উত্তর গোলার্ধে সরাসরি দক্ষিণ দিকে (দক্ষিণ গোলার্ধে উত্তর দিকে) এমন কোণে বসানো হয় যা সবচেয়ে ভালো ফলাফল দেয়।
সৌর প্যানেলের দক্ষতা: কতটা শক্তি রূপান্তরিত হয়?
সৌরসেলের দক্ষতা বলতে বোঝায় সূর্যালোকের কতটা অংশ বিদ্যুতে রূপান্তরিত হচ্ছে। এটি নির্ভর করে সেমিকন্ডাক্টর পদার্থ এবং প্রযুক্তির ধরনের উপর। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি বাণিজ্যিক প্যানেলের গড় দক্ষতা ছিল ১০%-এর কম। ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫%-এ, এবং এখন আধুনিক প্যানেল ২৫% দক্ষতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। পরীক্ষামূলক সৌরসেল এবং মহাকাশ স্যাটেলাইটের জন্য বিশেষ সেল প্রায় ৫০% দক্ষতা অর্জন করেছে।
বিশ্বব্যাপী সৌরশক্তির ব্যবহার এবং নেতৃত্ব
২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তারপর জাপান, জার্মানি এবং ভারত।
যুক্তরাজ্যের প্রথম ট্রান্সমিশন-সংযুক্ত সৌর খামার ২০২৩ সালের মে মাসে চালু হয়। ব্রিস্টলের কাছে অবস্থিত এই সৌর কেন্দ্রটি বছরে ৭৩,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ১৭,৩০০টি বাড়ি চালানোর জন্য যথেষ্ট। এটি প্রতি বছর ২০,৫০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হ্রাস করবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩ সালে ইউটিলিটি-স্কেল সৌর কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৬২ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে, যা ২০০৪ সালের মাত্র ৬ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা থেকে বিশাল বৃদ্ধি। ছোট আকারের গ্রিড-সংযুক্ত সিস্টেম (যেমন বাড়ির ছাদের প্যানেল) থেকে ২০২৩ সালে প্রায় ৭৪ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ এসেছে।
যুক্তরাজ্য সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে সৌরশক্তি উৎপাদন পাঁচগুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে, যা ৭০ গিগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে এবং প্রায় ২০ মিলিয়ন বাড়িতে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের সোলার ফিউচার স্টাডি অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের ৪০% বিদ্যুৎ সৌরশক্তি থেকে আসতে পারে।
সৌরশক্তির ব্যবহার: অফ-গ্রিড থেকে গ্রিড-সংযুক্ত
সৌরশক্তির বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। যেখানে বিদ্যুতের লাইন নেই, সেখানে সৌর প্যানেল সরাসরি পানির পাম্প বা অন্যান্য যন্ত্র চালাতে পারে। এটি ব্যাটারি চার্জ করে রাতে বা মেঘলা দিনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। আবার জাতীয় গ্রিডের সাথে সংযুক্ত হয়ে বড় পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
সৌরশক্তির কিছু অনন্য সুবিধা রয়েছে:
– যেখানে বিদ্যুৎ লাইন পৌঁছায় না, সেখানে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়
– খুব দ্রুত স্থাপন করা সম্ভব
– বাড়ির ছাদে বসানো সৌর প্যানেলের পরিবেশগত প্রভাব খুবই কম
কী শিখলাম?
সৌরশক্তি আজ আর শুধু ভবিষ্যতের স্বপ্ন নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা। ফোটোভোল্টাইক প্রযুক্তির মাধ্যমে সূর্যের ফোটন থেকে ইলেকট্রন মুক্ত করে বিদ্যুৎ তৈরির এই প্রক্রিয়া অসাধারণ সরল অথচ শক্তিশালী। ১৮৩৯ সালে বেকেরেলের আবিষ্কার থেকে শুরু করে আজকের ৫০% পর্যন্ত দক্ষ সৌরসেল — এই যাত্রা মানুষের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে সৌরশক্তি শুধু পরিবেশ রক্ষায় নয়, বরং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশসহ সূর্যালোক সমৃদ্ধ দেশগুলোতে এই প্রযুক্তির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, যা আমাদের শক্তি স্বাধীনতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ — উভয় লক্ষ্য পূরণ করতে পারে।
সূত্র: ন্যাশনাল গ্রিড, ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন